উপলব্ধি

মনে ভাবলাম তোমার কাছে যাব ,

নিজের করে তোমায় কাছে পাব।

তোমায় পাওয়ার কঠিন পণ নিয়ে –

 মন বাঁধলাম, ঘর ছাড়লাম ,

পথ মাপলাম, হৃদস্পন্দন দিয়ে।

তুমি কোথাও আপন মনে হেসেছিলে ,

নিমেষ পরে, আপন খেলায় আবার মেতেছিলে।

**

অনেকবার পথ হারালাম, আবার পেলাম,

অনেক সাগর, পাহাড় , নদী পেরিয়ে গেলাম।

মনখানিকে একটি তারে বেঁধে,

সুখগুলোকে পায়ে ঠেলে, দুঃখ-বিলাস আপন করে,

অনুরাগ রাগ গেলাম শুধু সেধে।

তুমি তখন আপন কাজে ব্যস্ত।

 জগৎ ভার তোমার কাঁধে ন্যস্ত।

**

জগৎ ঘুরে যখন শেষে তোমার দেখা মিলল ,

ভাবছি মনে, এইবার, এই এতো দিনে,  কপাল আমার ফিরল।

তখন দেখি আছি যেথায় প্রথম শুরু করেছিলেম !

তোমায় কাছে পাব বলে,

প্রথম পণ করেছিলেম , প্রথম মন বেঁধেছিলেম !

তুমি বললে, “সারাটি সময় তোর সাথে পথে পথে ঘুরেছি ,

তোর একতারাতে তানটি হয়ে, দিনরাত বেজেছি। “

**

অবাক আমি । ” তুমি যদি ছিলে পাশে –

আকুল হয়ে  পথে পথে ফিরলাম আমি কিসের আশে !?!

তোমায় অনুভবে না জেনে –

এতগুলো পথের বাঁক, এতগুলো হৃদস্পন্দন,

বেড়ালাম শুধু নিজের বোঝা টেনে! “

তুমি বললে, ” দুঃখ কিসের ওরে পাগল! –

অন্ধ ছিলি, চোখ ফুটলো, ভেঙে এবার মনের আগল ,

মাত তবে উৎসবে! মাত তবে উৎসবে!  “

****

Poetry

কেউ কথা রাখেনি: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

কেউ কথা রাখেনি
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো কেউ কথা রাখেনি
ছেলেবেলায় এক বোষ্টুমি তার আগমনী গান হঠাৎ থামিয়ে বলেছিলো
শুক্লা দ্বাদশীর দিন অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে
তারপর কত চন্দ্রভুক অমবস্যা এসে চলে গেল, কিন্তু সেই বোষ্টুমি আর এলো না
পঁচিশ বছর প্রতীক্ষায় আছি ।

মামাবাড়ির মাঝি নাদের আলী বলেছিল, বড় হও দাদাঠাকুর
তোমাকে আমি তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবো
সেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর খেলা করে !
নাদের আলি, আমি আর কত বড় হবো ? আমার মাথা এই ঘরের ছাদ
ফুঁরে আকাশ স্পর্শ করলে তারপর তুমি আমায় তিন প্রহরের বিল দেখাবে ?

একটাও রয়্যাল গুলি কিনতে পারিনি কখনো
লাঠি-লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্কর বাড়ির ছেলেরা
ভিখারীর মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি ভেতরে রাস উৎসব
অবিরল রঙ্গের ধারার মধ্যে সুবর্ণ কঙ্কণ পড়া ফর্সা রমণীরা কতরকম আমোদে হেসেছে
আমার দিকে তারা ফিরেও চায়নি !
বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, দেখিস, একদিন আমরাও…
বাবা এখন অন্ধ, আমাদের দেখা হয়নি কিছুই
সেই রয়্যাল গুলি, সেই লাঠি-লজেন্স, সেই রাস উৎসব
আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবে না !

বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে বরুণা বলেছিল,
যেদিন আমায় সত্যিকারের ভালবাসবে
সেদিন আমার বুকেও এরকম আতরের গন্ধ হবে !
ভালবাসার জন্য আমি হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়েছি
দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড়
বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮ নীলপদ্ম
তবু কথা রাখেনি বরুণা, এখন তার বুকে শুধুই মাংসের গন্ধ
এখনো সে যে কোন নারী !
কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনা !

Kobita

প্রেমের কবিতা: আল মাহমুদ

সোনালী কাবিন-৫ -আল মাহমুদ |

আমার ঘরের পাশে ফেটেছে কি কার্পাশের ফল?

গলায় গুঞ্জার মালা পরো বালা, প্রাণের শবরী,

কোথায় রেখেছো বলো মহুয়ার মাটির বোতল

নিয়ে এসো চন্দ্রালোকে তৃপ্ত হয়ে আচমন করি।

ব্যাধির আদিম সাজে কে বলে যে তোমাকে চিনবো না

নিষাদ কি কোনদিন পক্ষিণীর গোত্র ভুল করে?

প্রকৃতির ছদ্মবেশে যে-মন্ত্রেই খুলে দেন খনা

একই জাদু আছে জেনো কবিদের আত্মার ভিতরে।

নিসর্গের গ্রন্থ থেকে, আশৈশব শিখেছি এ-পড়া

প্রেমকেও ভেদ করে সর্বভেদী সবুজের মূল,

চিরস্থায়ী লোকালয় কোনো যুগে হয়নি তো গড়া

পারেনি ঈজিপ্ট, গ্রীস, সেরাসিন শিল্পীর আঙুল।

কালের রেঁদার টানে সর্বশিল্প করে থর থর

কষ্টকর তার চেয়ে নয় মেয়ে কবির অধর।

প্রেমের কবিতা

বিবাহিতাকে – জয় গোস্বামী

তোমার ভিতরে একটা বুনো ঝোপ দেখতে পাই।
ওই ঝোপে একটা মৃতদেহ ঢাকা দেওয়া আছে।
অনেকদিন ধ’রে আছে। কিন্তু আশ্চর্য যে
এই মৃতদেহ জল, বাতাস, রৌদ্র ও সকলপ্রকার
কীট-বীজাণুকে প্রতিরোধ করতে পারে। এরপচন নেই।
বন্য প্রাণীরাও এর কাছে ঘেঁষে না।
রাতে আলো বেরোয় এর গা থেকে।
আমি জানি, মৃতদেহটা আমার।
কিন্তু ব্যাপারটা হচ্ছে, এই জারিজুরি এবার ফাঁস হওয়া প্রয়োজন।
আর তা হবেও, যেদিন চার পায়ে গুঁড়ি মেরেগিয়ে
পা কামড়ে ধ’রে, ওটাকে, ঝোপ থেকে
টেনে বার করব আমি।

বিবাহিতাকে

জননী একাত্তর

(সাহসীকা জননী রমা চৌধুরী স্মরণে)

আঠারোটি বই। দুটো খালি পা। এক জোড়া অন্তরীক্ষ চোখ।

গান পাউডারে পোড়া এক টুকরো ভিটেবাড়ি,

একটা আহত চড়াই আর লোলুপ শকুনের ঠোঁট।

সামাজিক বাঁকা হাসি, হিশ হিশ-সাপের ছোবলে বিষ,

আটচল্লিশ জুড়ে জমে থাকা এইসব

পড়ে আছে। তিনটি জোনাকি এসে নিয়ে গেছে তাকে।

এক একটি শব্দ যেন এক একটি শবদেহ। কাগজ কাফন আর দোয়াত কফিন।

লিখে কাটা। কেটে লেখা। কাটাকুটি মেঘে ঢাকে গোটা দুই দিন।

হঠাত ব দ্বীপ হয়ে ভেসে ওঠে এই নাম –রমা মা। জননী একাত্তর।

তিনটি জোনাকি এসে ভালোবেসে নিয়ে গেছে তাকে-

শহীদ মিনার থেকে চেরাগী পাহাড় মোড় ।

Kobita

Post-58: "আমার স্বাধীনতা"

আমি মুক্ত স্বাধীন ছেলেবেলা,

আমি হাঁসের জলকেলি খেলা।

আর বৃষ্টির টুপটাপ সুর,

আমি মেঘের দূর গুড়গুড়।

আমি বিশাল গাছের উঁচু মাথা,

আমি সদ্য ফোঁটা ব্যাঙের ছাতা।

নীরব প্রাণীর অবুজ চোখ,

আমি পায়রাগুলোর অবাক ঠোঁট।

আমি ভিজিয়ে ওঠা উঠোন-বাড়ি,

কাপড়হীন শুকানোর দড়ি।

আমি লাল ইটের এই পুকুরপাড়।

আমি স্বাধীনতা আছে শুধু তার।

………##………

(21/08/18)

Poems

প্রশ্ন-কথা

মৃত্যুর আগে জিজ্ঞেস করব তোকে,

তার আগে, তোর আর আমার কথা হবে,

এ সাহস তোর নেই।

অরির সাথে কি সেভাবেই কথা বলিস,

যেমন বলতিস আমার সাথে রাত জেগে?

বলেছিস তাকে,

ছবি তুলতে কত ভালবাসিস তুই?

আচ্ছা সেও কি তুলে দেয় ছবি, যেমন আমি তুলতাম?

বলেছিস তাকে,

যে লঞ্চে উঠতে কত ভয় পাস তুই?

ওঠার সময় তারও কি ওভাবেই হাত ধরিস ,

যেমন ধরতিস আমার?

অমিত্রকেও কি জিজ্ঞ্যেস করিস, ওমন ছোটো ছোটো দোমনাতে?

আচ্ছা ওকেও বলিস বুঝি রাত জেগে, চুপিসারে গান শোনাতে?

সেও কি ওভাবেই রাত জেগে থাকে তোর,

পড়া শেষ না হওয়া অবধি?

বলেছিস তাকে,

ফুচকা খেতে কত ভালবাসিস তুই?

তাকেও কি বারণ করেছিস চলন্ত ট্রেনে উঠতে,

যেমন আমায় করতিস?

আচ্ছা সেও কি ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকে,

তোকে যেতে দেখে ?

তুইও বুঝি এখন তেমনই ফিরে চাস,

যেমন চাইতিস?

বলেছিস তাকে, তোর মিষ্টি আসক্তির কথা?

আচ্ছা তাকেও কি ভালবেসেছিস, যেমন

আমাকে বলেছিলি বেসেছি ?

বলেছিস তাকে?

এই কিছু প্রশ্ন তোকে শেষের সময়ে করবো,

তার আগে তোর আর আমার কথা হবে,

সে সাহস তোর নেই।